তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধিঃ জাকির হোসেন-টুটুল।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার কাজ ফেলে অধিকাংশ ঠিকাদার নিরুদ্দেশ বলে অভিযোগ উঠেছে। কাজ শেষ করতে একাধিকবার তাগাদা দিলেও কর্নপাত করছেনা ঠিকাদারেরা বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা।
স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের এসব ঠিকাদারের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে (এলজিইডি) অফিস। দীর্ঘদিন যাবত রাস্তার কাজ ফেলে রাখায় চরম দূর্ভোগে পড়েছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। ভুক্তভোগী মানুষ এবিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদুক) এর জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা সহ সরেজমিন তদন্ত পুর্বক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, একাধিকবার তাগাদা দিয়ে চিঠি দেয়ার পরেও কাজ শুরু করছে না ঠিকাদার। অবস্থাটা এমন, অফিসের কোন কথায় কর্নপাত না করে উল্টো অফিস ঘেরাও সহ নানা হুমকি ধামকি দেয়া হচ্ছে কর্মকর্তাদের। ফলে কর্তৃপক্ষ কাজ শেষ করা নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছে। এছাড়াও উৎকোচ সুবিধা পেয়ে অনেক সময় নিরবতা পালন করছেন সংশ্লিষ্টরা বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলকায় প্রায় ১০ টি গ্রামীণ রাস্তার সংস্কার কাজ শুরু হয় প্রায় এক থেকে দেড় বছর আগে। কয়েকটি রাস্তা প্রায় বছর ধরে পড়ে আছে। জিওবি মেন্টেনেন্স প্রকল্পের কাজগুলো করছেন শহরের প্রভাবশালী ঠিকাদার। তিনি বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টে প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে উপজেলার প্রায় রাস্তার কাজ কিনে নেয়। অগ্রিম পনের থেকে বিশ পারসেন্ট লাভ দিয়ে কাজগুলো কিনে একেবারে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে শুরু করেন। প্রথমে ট্যাক্টর দিয়ে রাস্তা উল্টিয়ে ফেলা হয়। উল্টিয়ে পুরাতন খোয়া, পাথর দেয়া হয়। নামমাত্র বালু দিয়ে লোক দেখানো রোলার করা হয়।রাস্তার দুপাশে নতুন ইট দিয়ে এজিং করার কথা থাকলেও পুরাতন ইট ও বালুর বিপরীতে মাটি দিয়ে এজিং করা হয়েছে। এভাবেই এসব রাস্তার কাজ ফেলে লাপাত্তা হয়েছেন ঠিকাদার। অথচ তারা প্রতি নিয়তই (এলজিইডি) অফিসে আসছেন, কর্তার সঙ্গে খোশমেজাজে গল্প আড্ডা দিচ্ছেন, চা পান করছেন, আবার চলে যাচ্ছেন। কিন্তু কাজ করা হচ্ছে না।
স্থানীয়রা জানান,রাস্তার কাজের কোন অভিভাবক নাই। যদি থাকত তাহলে এত দিন ধরে পড়ে থাকত না। রাস্তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঠিকাদারের ইচ্ছায় চলে অফিসের কার্যক্রম। কোন অর্থ বছরের কাজ কত দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে এসবের কোন নির্দেশনা নাই। যে রাস্তা পড়ে আছে সেগুলো দিয়ে হাটা যাচ্ছে না। যানবহনে পণ্য বহন করা যাচ্ছে না। রাস্তার খোয়া উঁচু হয়ে আছে। প্রায় সময় পণ্যবাহী যান বিকল হয়ে পড়ছে। এখন জমি রোপনের কাজ চলছে। প্রতিদিন গাড়ীতে করে সার, শ্রমিক আনা নেয়া করতে হচ্ছে। কিন্তু রাস্তার বেহাল দশার কারনে যান নিয়ে যেতে চাচ্ছে না। প্রায় রাস্তায় কয়েকটি করে কার্লভাট নির্মান করা হয়েছে। নির্মানের সময় যত সামান্য সিমেন্ট বালু ও নিম্নমানের নামমাত্র রোড দেয়া হয়েছে। এসব কার্লভাটে মালবাহী যান উঠলেই ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কাজের সময় অফিসের লোকজন থাকে না। ঠিকাদার ও তাদের মিস্ত্রীরা ইচ্ছেমত কাজ করে। ঠিকাদার ও তার মিস্ত্রীরাই বড় প্রকৌশলী। আবার কোন কিছু বলা হলে শুনেনা উল্টো নানা ধরনের হুমকি ধামকি দিয়ে থাকে। বর্তমানে এখানে এমপি আছে। এসব কাজের বিষয়ে এমপির সরাসরি হস্তক্ষেপ করা একান্ত দরকার।
স্থানীয়রা জানান, শুস্ক মৌসুমে কাজ শুরু হয়েছিল। নিয়মিত ভাবে কাজ করলে শুস্ক মৌসুমেই কাজগুলো শেষ হয়ে যেত। এখন বর্ষা মৌসুম, প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টিতে খোয়ার রাস্তা কাদায় রুপ নিয়েছে। প্রায় জায়গায় রাস্তার খোয়া উঠে গর্তের সৃষ্টি হয়ে আছে। ঝড় বৃষ্টিতে রাস্তার পাশে থাকা গাছ উপড়ে পড়ে ভয়াবহ গর্তের সৃষ্টি হয়ে থাকলেও কোন গুরুত্ব নেই। মনে হয় এসব দেখভালের কেউ নেই, বলার কোন লোক নেই। প্রায় রাস্তার কাজ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শুরু হয়েছিল। দুএকটা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সময় শুরু হয়েছে। দীর্ঘ আট নয় মাস থেকে বছর ধরে পড়ে রয়েছে। অথচ ঠিকাদারেরা প্রায় দিন অফিসে এসে চা পান করছেন।
স্থানীয়রা জানান, তানোর পৌর এলাকার চাপড়া স্কুল মাঠ থেকে মিরাপাড়া মোড় পর্যন্ত, কলমা ইউপির কুজিশহর, আজিজপুর, দরগাডাংগা থেকে নটিপাড়া, স্বপ্নের মোড়, কাশিম বাজার থেকে নবনবী,মোহর-কৃষ্ণপুর, মোহর-আকচা,বনকেশর-বানিয়াল,প্রকাশনগর-গাল্লা ও
চন্দনকোঠাসহ একাধিক রাস্তার কাজ পড়ে রয়েছে। এদিকে নির্মাণ সামগ্রী চাপড়া স্কুল মাঠ, শুকদেবপুর স্কুল মাঠ ও বনকেশর স্কুল মাঠে পড়ে রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার চরম সমস্যা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসের এক ব্যক্তি জানান, প্রায় আটটির মত জিওবি মেন্টেনেন্স কাজের (৬) টিই ক্রয় করে নিয়ে করছেন শহরের প্রভাবশালী ঠিকাদার। তাকেসহ অন্যদের একাধিকবার চিঠি ও মৌখিক তাগাদা দেয়া হলেও কোন কর্নপাত করেন না। উল্টো অফিস ঘেরাওসহ নানা ধরনের হুমকি দিয়ে থাকে। বাকি ঠিকাদারদেরও একই রকম আচরণ। তাদের একটাই কথা নির্মান সামগ্রীর দাম বেড়ে গেছে এজন্য এখন কোনভাবেই কাজ করা যাবে না। চাপাচাপি করলে সমস্যা আছে। অতীতে অনেক কাজ হয়েছে। কাজ শুরুর পর নির্মান সামগ্রীর দাম বেড়েছে, কিন্তু এধরণের কথা শুনতে হয়নি। যার কারনে অফিসও চিঠি দিয়ে দায় সারছে। কারন এঅবস্থা শুধু তানোরে না, সারা দেশেই এমন অবস্থা চলছে। মব সৃষ্টির ভয়ে কর্তৃপক্ষ কোন কিছুই করতে পারছে না। তিনি আরো জানান, প্রকৌশলী সঠিকভাবে তদারকি করলে কাজগুলো শেষ হয়ে যেত। কিন্তু তিনি তেমন ভাবে গুরুত্ব দেয়নি। প্রায় ৬ কোটি টাকার কাজ পড়ে রয়েছে। কাজের মানও খুব একটা ভাল হয়নি। যে অর্থ বছরের কাজ সে অর্থ বছরেই শেষ করতে হবে। কারন অর্থবছর শেষ হলে হিসেব নিকেশ দিতে হয়। কিন্তু কাজ শেষ হয়েছে বলে বরাদ্দে অর্থ উত্তোলন করে অন্য একাউন্টে রাখা হয়। এভাবেই নিয়মগুলো অনিয়মে পরিনত হয়েছে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রকৌশলী নুর নাহার জানান, নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ার কারনে কাজ আপাতত বন্ধ আছে। ঠিকাদারদের চিঠি ও মৌখিক ভাবে কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।