শাহীন সুলতানা, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ):
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে আসন্ন উছমানপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইউপি সদস্য পদে প্রার্থিতা নিয়ে বিরোধের জেরে হুমকি-ধমকির শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন সৌদি আরবপ্রবাসী এক ব্যক্তির স্ত্রী। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, প্রতিপক্ষের হুমকির কারণে তাদের দুই শিশু সন্তান স্কুলে যেতে পারছে না। এতে তাদের পড়াশোনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ইউপি সদস্য পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন স্থানীয় ইউসুফ আলীর ছেলে ও কুলিয়ারচর বাজারের মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী পারভেজ মিয়া (৩৪)। একই ওয়ার্ড থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন সৌদি আরবপ্রবাসী মো. কাদির মিয়াও। এ নিয়ে পারভেজ মিয়া কাদির মিয়াকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রবাসীর পরিবার। এতে দুপক্ষের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
পরিবারের অভিযোগ, বিরোধের জেরে পারভেজের পক্ষের হিসেবে পরিচিত একই গ্রামের মৃত জাফর আলীর ছেলে সেতু মিয়া ও তাঁর লোকজন কাদির মিয়ার স্ত্রী ও সন্তানদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন। বাড়িতে পুরুষ সদস্য না থাকায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন প্রবাসীর স্ত্রী রাবেয়া বসরি ও তাঁর সন্তানরা।
বাড়িতে ঢুকে হুমকি ও মোবাইল ফোন ভাঙচুরের অভিযোগ
রাবেয়া বসরির অভিযোগ, গত ২৩ আগস্ট দুপুর ১টা ৩৭ মিনিটে সেতু মিয়ার পক্ষের ফুল নাহার ও অজুফা বেগম লাঠি নিয়ে তাঁদের বসতবাড়িতে প্রবেশ করেন। এ সময় তাঁরা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং তাঁর দুই শিশুসন্তানকে হত্যার হুমকি দেন। একপর্যায়ে ফুল নাহার তাঁর হাত থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের একটি আইফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পুরো ঘটনা বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন রাবেয়া বসরি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্কুলে যাওয়া-আসার পথে তাঁর সন্তানদের নিয়মিত পথরোধ করে হত্যা ও গুমের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে ভয়ে শিশুরা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দুই শিশু হলো ৯ বছর বয়সী আদিবা তাবাসসুম ও ১৩ বছর বয়সী মাহমুদুল হাসান ওরফে রাফি। আদিবা স্থানীয় ৫১ নম্বর নাজিরদিঘী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। আর রাফি কুলিয়ারচর উদয়ন কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।
আতঙ্কে বাড়িছাড়া পরিবার
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাবেয়া বসরি বলেন, “আমার স্বামী প্রবাসে থাকায় বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ নেই। এই সুযোগে প্রতিপক্ষরা আমাকে ও আমার ছোট ছোট সন্তানদের মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। তাদের ভয়ে বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারছে না। বাড়িতে এসে আমার ফোনও ভেঙে দিয়েছে। আমরা এখন চরম আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র দিন কাটাচ্ছি। আমার দুই সন্তানের পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।”
তিনি জানান, হুমকি-ধমকির ঘটনায় গত ৭ অক্টোবর আফজাল মিয়া (২৮), শিপা বেগম (২৩) ও মোছা. জোসনা বেগমের (২৮) বিরুদ্ধে কুলিয়ারচর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডি নম্বর ৩১৫।
এ ছাড়া গত ২২ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এ ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭/১১৪/১১৭(সি) ধারায় পারভেজ মিয়া, সেতু মিয়া, কাইয়ুম মিয়া, ফুল নাহার, অজুফা বেগম ও সেলিনা বেগমের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন বলেও জানান তিনি। মামলার নম্বর ৫৬১।
ভয়ে স্কুলে যেতে চায় না দুই শিশু
আদিবা তাবাসসুম জানায়, সেতু মিয়ার সঙ্গে দেখা হলে তিনি তার বাবার নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন করে হুমকি দিয়েছেন বলে তার অভিযোগ। এরপর থেকে সে আর স্কুলে যাচ্ছে না।
অন্যদিকে মাহমুদুল হাসান ওরফে রাফি জানায়, একদিন অটোরিকশায় পারভেজের সঙ্গে দেখা হলে তাঁর বাবার মেম্বার পদে প্রার্থিতা নিয়ে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। এ ধরনের কথা তাকে একাধিকবার বলা হয়েছে বলে দাবি করে সে। পরে বিষয়টি স্কুলের এক শিক্ষককে জানালে ওই শিক্ষক তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেন। এরপর থেকে ভয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে রাফি।
রাফি বলে, “আমি লেখাপড়া করতে চাই।”
স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
কুলিয়ারচর উদয়ন কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড স্কুলের প্রধান শিক্ষক সলিল কান্তি রায় বলেন, মাহমুদুল হাসান ওরফে রাফি তাঁদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। হুমকি-ধমকির বিষয়টি নিয়ে দুপক্ষকে ডেকে মীমাংসা করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ওয়াসিম চৌধুরী বলেন, রাফি প্রায় ১৭ থেকে ১৮ দিন ধরে স্কুলে আসছে না। তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন, পারিবারিক সমস্যার কারণে ভয়ে বাড়িতে অবস্থান করছে শিশুটি। দীর্ঘদিন স্কুলে না আসায় তার পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, নাজিরদিঘী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সন্ধ্যা রাণী বলেন, আদিবা তাবাসসুম তাঁদের বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে অনেক দিন ধরে স্কুলে আসছে না। তবে কী কারণে সে অনুপস্থিত, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাতে পারেননি।
অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্তদের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পারভেজ মিয়া তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, আসন্ন উছমানপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য পদে তিনি প্রার্থী। সৌদি আরবপ্রবাসী কাদির মিয়াও একই পদে প্রার্থী হতে চান। তবে তাঁদের মধ্যে প্রার্থিতা নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। কাদির মিয়ার দুই সন্তানকে তিনি বা তাঁর লোকজন কোনো ধরনের হুমকি দেননি বলেও দাবি করেন পারভেজ।
সেতু মিয়াও তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। কাদির মিয়ার সন্তানদের আমি দেখিওনি, চিনিও না। তাদের বা তাদের মাকে হুমকি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমাদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
তিনি আরও বলেন, তিনি নিজেও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য পদে প্রার্থী। পারভেজ ও কাদির মিয়াও প্রার্থী হতে চান। জনগণ যাঁকে ভোট দেবে, তিনিই নির্বাচিত হবেন।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা
এ বিষয়ে কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক জানান, রাবেয়া বসরি নামে এক নারী হুমকি-ধমকির বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জিডি নম্বর ৩১৫-এর তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসআই (নিরস্ত্র) আবু কায়সার বলেন, জিডিটি তদন্তের অনুমতির জন্য গত ৮ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতের অনুমতি পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে কুলিয়ারচরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাফফাত আরা সাঈদ বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিপক্ষের হুমকির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুই শিশুর শিক্ষাজীবন স্বাভাবিক রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।