আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি ঃ
দুই দশক আগের করা চুক্তির বিপরীতে গিয়ে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার পরিকল্পনার কথা বলার পর দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছে।
এরই মধ্যে সেখানে বিক্ষোভ হয়েছে, আরও বড় কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার যদি এই পথে হাঁটে, তাহলে প্রতিরোধ করা হবে।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আগামী ২৪ আগস্ট ঢাকা থেকে ফুলবাড়ীর উদ্দেশে ‘প্রচার যাত্রা’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি বাতিলসহ আরও নানা দাবি রয়েছে। ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে গণসমাবেশের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।
গত বুধবার রাতে ফুলবাড়ী পৌর শহরের নিমতলা মোড়ে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাবের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে গণসংহতি আন্দোলন। সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা মিছিল শেষে সেখানে সমাবেশ করেন।
২০০৬ সালের আন্দোলনের পর সরকারের সঙ্গে চুক্তিটি হয়েছিল তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে। এবারও এই কমিটির নেতৃত্বেই সেখানে আন্দোলন করা হচ্ছে।
কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, “২০০৬ সালের গণঅভ্যুত্থানে আমরা তিনজনকে হারিয়েছি, আরও ২০০ জনেরও বেশি আহত হয়। এবারও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য ফুলবাড়ীবাসী ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছে। এরপরও যদি সরকার আগাতে চায়, তাহলে প্রতিবাদ হবে, প্রতিরোধ হবে। আমরা তো সহজে আমাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে দেব না, তাই না?”
গত ১৬ আগস্ট অর্থনমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঢাকায় আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত এক সভায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
তিনি সেদিন বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন আমরা কয়লার উত্তোলনের দিকে যাচ্ছি। ফুলবাড়ী ও অন্যান্য স্থানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনে এগোতে হচ্ছে। কারণ আমাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মিশ্রণের বিষয়ে আমরা মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতি দেয়া হবে।”
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্ষেত্রে বহুমুখী জ্বালানির ওপর নির্ভর করে। সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর। তবে সরবরাহ সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বেশিরভাগ কেন্দ্রই এখন বন্ধ।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সময় পরিবেশ দূষণের বিষয়টি সামনে এনে নানা সমালোচনা হয়েছিল। তবে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার এসব বিরোধিতা পাত্তা দেয়নি। বর্তমানে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশই কয়লা থেকে আসে।
বাংলাদেশে কয়লার চাহিদা বছরে ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে দুই কোটি টনের মধ্যে। বড়পুকুরিয়া কোল মাইন কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, সেখানে উৎপাদন সাড়ে সাত লাখ টনের মতো। বাকিটা আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অন্য জ্বালানির পাশাপাশি কয়লার দাম বৃদ্ধিও বাংলাদেশকে চাপে রেখেছে।
সরকার মনে করছে, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের মাধ্যমে বছরে প্রায় দেড় কোটি টন কয়লা পাওয়া গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে।
বাংলাদেশে মোট পাঁচটি কয়লাখনি রয়েছে। এর মধ্যে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে প্রায় ৫ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন টন, রংপুরের খালাশপীরে ৬৮৫ মিলিয়ন টন, দিনাজপুরের দিঘিপাড়ায় ৭০৬ মিলিয়ন টন, বড়পুকুরিয়ায় ৪১০ মিলিয়ন টন এবং ফুলবাড়ীতে প্রায় ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদের কথা বলা হয়।
ফুলবাড়ীর কয়লাখনি এলাকায় ভূগর্ভের তুলনামূলক অল্প গভীরতায় কয়লার স্তর রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথি ও আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী কেবল ফুলবাড়ী নয়, সবগুলো খনিতেই উন্মুক্ত পদ্ধতিতে যাওয়ার কথা বলছেন, যে পদ্ধতি নিয়ে দেশে বিতর্ক নতুন নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বদরুল ইমাম এই পদ্ধতিতে যাওয়ার ঘোরতর বিরোধী।
তিনি টাইমসকে বলেন, “বাংলাদেশ সমতল কৃষি জমির এবং অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এমন একটি দেশে উন্মুক্ত পদ্ধতির খনি কোনো বিকল্প হতেই পারে না। এখানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অত্যন্ত বেশি হবে।”
তার মতে কয়লার আর্থিক মূল্যর চেয়ে মানুষের জীবন, জীবিকার এবং সহায়-সম্পদের মূল্য অনেক বেশি।
“যারা ওপেন পিট মাইনিংয়ের কথা বলেন, তারা আসলে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝেন না। মানুষের যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হবে, সেটিকে তারা মুখ্য বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন না; অথচ মানুষের ক্ষয়ক্ষতিটাই এখানে সবচেয়ে বড় ও মুখ্য বিষয়”, টাইমসকে বলেন তিনি।
এই ভূতত্ত্ববিদের মতে উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনির কয়েকটি বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। এতে বিশাল জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি হবে। খনির বিশাল এলাকা জুড়ে অত্যন্ত গভীর গর্ত করতে হবে।
এতে ভূগর্ভস্থ জলাধারের চিরস্থায়ী ক্ষতি হবে। উন্মুক্ত হলে খনির বিরাট খাদের মধ্যে বিশাল পুকুর বা লেক তৈরি হবে। এই বিপুল পরিমাণ পানিকে নিয়ন্ত্রণ বা নিষ্কাশন করবে করা অত্যন্ত জটিল সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।
এতে মাটির অস্থিতিশীলতা ও ধসের আশঙ্কাও করছেন বদরুল ইমাম। বাংলাদেশ মূলত নরম পলিমাটির দেশ হওয়ায় উন্মুক্ত খনির যে পার্শ্ববর্তী অংশ বা পাড় থাকবে, তা ধসে পড়তে পারে।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েলও বলেন, “কয়লা তো ২০ থেকে ৩০ বছরের প্রকল্প। আর এই জমি তো আমাকে অনন্তকাল পর্যন্ত শস্য দিয়ে যাবে, পুকুর অনন্তকাল পর্যন্ত মাছ দিয়ে যাবে।”
তিনি বলেন, “তারা আমাদের জীবন, সংস্কৃতিক, সুপেয় পানি-সব কিছু ধ্বংস করে অনিশ্চিত জীবনে ফেলতে চান। এই জীবনের মূল্য আর কয়লা সম্পদের মূল্য কি সমান হয়?”
ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের চেষ্টা বিএনপির আগের সরকারের আমলেও হয়েছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এশিয়া এনার্জি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার বিষয়ে কথাবার্তা শুরু করেছিল।
তবে ২০০৬ সালে এ পদ্ধতির বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন আন্দোলনে অংশ নেয়।
ওই বছরের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে সেদিন এশিয়া এনার্জির অফিস অভিমুখে বিশাল এক মিছিলে তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর ও পুলিশের গুলিতে তিনজন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়।
এই ঘটনায় ফুলবাড়ী এলাকায় তীব্র গণবিক্ষোভ শুরু হয় এবং প্রশাসন প্রায় কার্যকারিতা হারায়। পরে ৩০ আগস্ট বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছয় দফা চুক্তি হয়।
সরকারের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সে সময়ের মেয়র ও বর্তমানে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। আন্দোলনকারীদের পক্ষে সই করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
সেই চুক্তির দ্বিতীয় ধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল ফুলবাড়ীসহ দেশের কোথাও কোনো উন্মুক্ত বা খোলা মুখ পদ্ধতিতে কয়লা খনি প্রকল্প করা যাবে না। এশিয়া এনার্জিকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কারের কথাও বলা হয়।
সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, “সেই চুক্তির তো এখনও অনেক কিছু বাস্তবায়ন করা হয়নি। আমরা বরং এ নিয়ে দাবি তুলছি।”
তিনি আরও একটি প্রশ্ন তুলেছেন, সেটি হলো, উন্মুক্ত পদ্ধতি নিয়ে কেন অর্থমন্ত্রী কথা বললেন।
“এ নিয়ে তো কথা বলবেন জ্বালানি মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী। আমরা তো তাদের মুখ থেকে কিছু শুনলাম না। আমরা সরকারের একটি ব্যাখ্যা চাইছি”, বলেন ফুলবাড়ীর এই আন্দোলনকারী।