নিজস্ব প্রতিনিধ আবুল কাশেম।
সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি সমাজের বিবেক, সত্যের অনুসন্ধান এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক নিরন্তর সংগ্রাম। সংবাদকর্মীরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমাজের অন্ধকার দিকগুলো আলোকিত করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন এবং জনগণের কাছে সত্য তুলে ধরেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যারা অন্যের কথা বলে, তাদের কথা বলবে কে?
পর্দার আড়ালে একজন সাংবাদিকের জীবন যতটা সম্মানজনক বলে মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই কঠিন, অনিশ্চিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সত্য প্রকাশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত তাকে মোকাবিলা করতে হয় ক্ষমতাবানদের চাপ, হুমকি, মামলা, হয়রানি এবং নানা প্রতিকূলতার। অনেক সময় জীবনের নিরাপত্তা পর্যন্ত হয়ে ওঠে অনিশ্চিত।
অথচ সমাজ খুব কমই মনে রাখে—একজন সাংবাদিকেরও একটি পরিবার আছে। তারও আছে স্ত্রী-সন্তান, স্বপ্ন, দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হাজারো ভাবনা। সংবাদ সংগ্রহের পথে বের হওয়া মানুষটির জন্য ঘরে অপেক্ষা করে থাকে উদ্বিগ্ন পরিবার। কিন্তু সেই উদ্বেগ, সেই ত্যাগ কিংবা সেই ঝুঁকির মূল্যায়ন খুব কম ক্ষেত্রেই হয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, সমাজের এক শ্রেণির সুবিধাবাদী মানুষ সাংবাদিকদের অনেক সময় ‘টিস্যু পেপার’-এর মতো ব্যবহার করে। প্রয়োজনের সময় সংবাদকর্মীর দ্বারস্থ হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা খোঁজে। কিন্তু সত্য প্রকাশিত হওয়ার পরই শুরু হয় হামলা, মামলা, হুমকি কিংবা অপপ্রচারের খেলা। আবার কোনো সংবাদ ব্যক্তিগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে সাংবাদিকের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয় নানা অপবাদ ও তকমা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংকট আরও গভীর হচ্ছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, মূলধারার অসংখ্য সৎ, নিষ্ঠাবান ও ত্যাগী সংবাদকর্মী নীরবে হারিয়ে যাচ্ছেন। কেউ বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন, কেউ চুপ করে যাচ্ছেন, আবার কেউ প্রতিনিয়ত মানসিক ও আর্থিক চাপে ভেঙে পড়ছেন। কারণ সমাজ সত্য জানতে চাইলেও সত্য বলার মানুষকে যথাযথ মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সম্মান দিতে এখনো শিখে ওঠেনি।
আজ সাংবাদিকদের কলম শুধু সংবাদ লেখে না; সেই কলম লিখে মানুষের অধিকার, বঞ্চনা, দুর্নীতি, অন্যায় ও অবহেলার গল্প। কিন্তু অনেক সময় সেই কলমের কালি রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। তবুও তারা থেমে থাকেন না। কারণ সত্যের পথে হাঁটা কখনোই সহজ ছিল না, আজও নয়।
রাষ্ট্র, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আজ সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যারা সমাজের আয়না হয়ে সত্য তুলে ধরে, তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করবে কে? যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়ায়, তাদের পাশে দাঁড়াবে কে?
কলম এখনো লিখছে। সংবাদকর্মীরা এখনো সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু সেই কলমের নীরব কান্না, সেই অদৃশ্য রক্তক্ষরণ, সেই অবহেলার দীর্ঘশ্বাস—আমরা কি সত্যিই শুনতে পাচ্ছি?
সাংবাদিকরা আজও সত্যের পথে অবিচল। কিন্তু প্রশ্নটি রয়ে গেছে—সাংবাদিকরা যাবে কোথায়?