শাহীন সুলতানা, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ)
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে মাদকের টাকার জন্য পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে ফুল মিয়া নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সর্বশেষ এক দোকানদারকে মারধরের পর পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতে চাইলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে মা ও বোনকে মারধর করে নিজের ঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
বুধবার রাতে কুলিয়ারচর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বড়খারচর মহল্লায় হাবিব কাউন্সিলরের বাড়িসংলগ্ন আবু বক্করের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।
পরিবারের অভিযোগ, আগুনে ঘরের আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, বই-খাতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ প্রায় সবকিছু পুড়ে গেছে। ঘরটি তালাবদ্ধ থাকায় ভেতরে থাকা ১৫টি হাঁস ও প্রায় ৪০টি দেশি মুরগিও বের হতে পারেনি। এতে সেগুলো পুড়ে মারা যায় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
ফুল মিয়ার মা রুবিনা বেগম অভিযোগ করে বলেন, তাঁর ছেলে প্রায় প্রতিদিন নেশা করে বাড়িতে এসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঝগড়া ও মারধর করেন। কখনো দা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ তাঁর।
রুবিনা বেগম বলেন, ‘আমি আমার ছেলের কঠিন শাস্তি চাই। তাকে যদি ফাঁসি দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হোক। নয়তো সে আমার অন্য ছেলেদেরসহ আমাদেরও মেরে ফেলবে।’
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, বুধবার রাতে বাড়ির সামনে এক দোকানদারের সঙ্গে ফুল মিয়ার মারধরের ঘটনা ঘটে। পরে কেন দোকানদারকে মারধর করা হয়েছে, তা জানতে চাইলে ফুল মিয়া তাঁকেও দা দিয়ে কোপানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে রাস্তায় গিয়ে স্থানীয় লোকজনকে ডাকেন। পরে লোকজন নিয়ে বাড়িতে ফিরে দেখেন, তাঁর ঘরে আগুন জ্বলছে।
রুবিনা বেগমের অভিযোগ, ‘ঘরে আগুন দেওয়ার পর ফুল মিয়া বিভিন্ন দিকের দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। ফলে আমরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে পারিনি। আগুনে আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।’
পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগে বাড়ির সামনের একটি দোকানে বাকি চান ফুল মিয়া। দোকানদার আবুল হোসেন (৬০) বাকি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে রড দিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। আবুল হোসেন সম্পর্কে আবু বক্করের মামা।
পরে দোকানদারকে মারধরের বিষয়টি জানতে চাইলে বাবা আবু বক্করের সঙ্গে ফুল মিয়ার কথা-কাটাকাটি হয়। এ সময় মা ও বোনের সঙ্গেও তাঁর বিরোধ বাধে। একপর্যায়ে বোনকে মারধর করে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেন বলে পরিবারের অভিযোগ।
আগুন লাগার খবর পেয়ে স্থানীয়রা তা নেভানোর চেষ্টা করেন। পরে কুলিয়ারচর ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এর আগেই ঘরের অধিকাংশ মালামাল পুড়ে যায়।
ফুল মিয়ার ছোট ভাই দিপু বলেন, ‘আমরা চার ভাই বাড়িতে থাকি না, ঢাকায় কাজ করি। বড় ভাই মাদকের টাকার জন্য প্রায়ই বাবা-মাকে নির্যাতন করে। গত রাতের ঘটনায় আমরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
ফুল মিয়ার বাবা আবু বক্কর বলেন, ‘নিজের ছেলে আমাদের এভাবে শেষ করে দেবে, কখনো ভাবিনি। মাদকের টাকার জন্য সে প্রায়ই আমাদের সঙ্গে ঝগড়া ও মারধর করে। গত রাতের ঘটনায় ঘরবাড়ি, কাপড়চোপড়, আসবাবপত্র—সব পুড়ে গেছে। আমি বাবা হয়েও তার শাস্তি চাইতে বাধ্য হচ্ছি। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদকের কারণে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, একটি পরিবারও ধ্বংসের মুখে পড়ছে। তাঁরা মাদক বিক্রেতা ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে পুলিশ হেফাজতে ফুল মিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘বাড়িতে গেলে পরিবারের লোকজন আমার সঙ্গে চিৎকার-চেঁচামেচি করে। আমি কাজ করি না—এমন কথা বলে আমাকে বকা দেয়।’
ঘরে আগুন দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘরে আমারও অংশ আছে। আমাকে শুধু বকাঝকা করে। তখন আমি কী করব?’
তবে তাঁর বক্তব্যের সময় ঘটনার জন্য অনুতপ্ত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি।
ঘটনার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ফুল মিয়ার মাদকাসক্তি ও কথিত নির্যাতনের কারণে তাঁরা আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। সর্বশেষ আগুনের ঘটনায় পরিবারটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।