মোঃ ফয়সাল হোসেন খুলনা জেলা প্রতিনিধিঃ
সুন্দরবনঘেঁষা খুলনার কয়রার নদ-নদীতে অবাধে শামুক আহরণ করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় দিনের পাশাপাশি রাতেও নদীর তলদেশ ও চর থেকে বিপুল পরিমাণ শামুক তুলে নেওয়া হচ্ছে। এতে নদীর জলজ প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি কয়রা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কপোতাক্ষ নদের গোবরা গ্রামের বালুর চর ও নদের কয়েকটি পয়েন্টে শামুক আহরণের তৎপরতা চলছে। কোথাও শ্রমিকেরা জোয়ার-ভাটার সময় নদের তলদেশ থেকে শামুক সংগ্রহ করছেন, আবার কোথাও বালু তোলার কাজে ব্যবহৃত ড্রেজারসদৃশ যন্ত্রের মাধ্যমে নদের তলদেশ থেকে শামুকসহ বিভিন্ন জলজ উপাদান তুলে আনা হচ্ছে।
কয়রা সদরের কপোতাক্ষ নদের মদিনাবাদ ও গোবরা পয়েন্টে সরেজমিনে গিয়ে দুটি বোটে ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদের তলদেশ থেকে শামুক উত্তোলন করতে দেখা যায়। সেখানে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি বোট থেকে চার-পাঁচ ঘণ্টায় প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার শামুক সংগ্রহ করা সম্ভব বলে তাঁরা দাবি করেন। তাঁদের ভাষ্য, আহরণ করা শামুকের পুরো অর্থ তাঁদের হাতে থাকে না; স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিকে টাকা দিতে হয়। তবে ওই ব্যক্তিরা কার কাছে বা কী কারণে টাকা দেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নাম প্রকাশ করেননি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদী থেকে শামুক আহরণ বন্ধের জন্য তাঁরা একাধিকবার বাধা দিলেও প্রশাসন থেকে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
উপজেলার সদরের গোবরা গ্রামের বাসিন্দা তৈমুর হাসান বলেন, “দিনের পাশাপাশি রাতেও নদীতে শামুক তোলা হয়। এভাবে চলতে থাকলে নদীর তলদেশে শামুকের পরিমাণ আরও কমে যাবে। স্থানীয়ভাবে বাধা দেওয়া হলেও কাজ বন্ধ হচ্ছে না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, গোবরা-মদিনাবাদ সড়কের পাশে একটি বালুর আড়তের কাছ দিয়ে কয়েক দিন পরপর সন্ধ্যার পর ট্রাকে করে বিপুল পরিমাণ শামুক নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এসব শামুক কোথায় যাচ্ছে, কারা কিনছে এবং কোন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে—এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
খুলনার কয়রা উপজেলা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন আরও কয়েকটি নদী ও খালেও শামুক আহরণের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পশুরতলা খাল, কৈখালীর মাদার নদী, জয়াখালী খাল, শাকবাড়িয়া নদী, কয়রা নদী ও কপোতাক্ষ নদ থেকে নিয়মিত শামুক সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু, পরিবেশ ও বন রক্ষায় কাজ করা সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক তারিক লিটু বলেন, কপোতাক্ষসহ কয়রার নদ-নদী থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুক তুলে নেওয়া হলেও কার্যকর নজরদারি দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, শামুক আহরণের পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চালানোর পাশাপাশি আহরণ, পরিবহন ও বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের মাইকিং ও বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালানোর পরও নদী থেকে শামুক আহরণ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাঁদের দাবি, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, শামুক আহরণের উৎস, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ—পুরো প্রক্রিয়াটি নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
সুন্দরবনের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার মো. নাসির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি বন বিভাগের অভিযানে শামুক জব্দ করে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে। সুন্দরবন ও আশপাশের নদ-নদী থেকে নির্বিচারে শামুক আহরণ বন্ধে বন বিভাগের পাশাপাশি প্রশাসনের মোবাইল কোর্টের তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন।
স্থানীয় এনজিও আইসিডির প্রতিষ্ঠাতা মো. আশিকুজ্জামান বলেন, সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু মাছ, কাঁকড়া কিংবা বড় জলজ প্রাণী নয়, শামুকসহ ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীর প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। নদীর তলদেশ থেকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক হারে এসব প্রাণী তুলে নেওয়া হলে এর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব কী হতে পারে, তা জরুরি ভিত্তিতে সমীক্ষা করা প্রয়োজন।
খুলনা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, “নদ-নদী থেকে শামুক উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ। এর ফলে জলজ প্রতিবেশ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। চলতি সপ্তাহে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে শামুকসহ একটি ট্রাক জব্দ করা হয়েছে।”